বিনোদনের জন্য বইকেই প্রাধান্য দেন – আলী যাকের

আলী যাকের, আমাদের দেশের একজন স্বনামধন্য অভিনেতা। তিনি একই সাথে টেলিভিশন নাটক ও মঞ্চ নাটকে জনপ্রিয়। ১৯৪৪ সালের ৬ই নভেম্বর চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পৈতৃক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানায় হলেও, সরকারি কর্মকর্তা (ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট) পিতার বদলির সূত্রে শৈশব-কৈশোর কেটেছে তাঁর বিভিন্ন জেলায়।

বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন জগতের একজন অগ্রদূত আলী যাকের, এশিয়াটিক মার্কেটিং কমিউনিকেশন্স লিমিটেডের কর্ণধার।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সদা উজ্জীবিত এ মানুষটি অবদান রেখেছেন আমাদের সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে। এছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে তিনি লেখালেখির সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন তিনি। তাঁর সহধর্মিনী সারা যাকেরও একজন বিখ্যাত অভিনেত্রী।

সম্প্রতি BDtimes24.com- কে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি তাঁর কিছু মূল্যবান অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ বেতারের অতীত এবং বর্তমান রূপের মধ্যে যে পার্থক্য, সেটা কি?

– যুদ্ধকালীন যেকোনো রাষ্ট্রের রেডিও চরিত্রটি আসলে একটি বিদ্রোহী চরিত্র। তার সাথে নরমাল রেডিও-এর মিল আশা করাটা ঠিক নয়। এখনকার রেডিও স্বাধীন ও রাষ্ট্রীয় পরিচয় সম্পন্ন। এবং এর রাষ্ট্রের সাথে যায় এমন দর্শনও আছে, যেটা বর্তমানের সাথে প্রতিবিম্বিত হয়। কেবল নেগেটিভ দিকটি হল- এটা সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম, যেটা কিনা সর্বোপরি গন মানুষের নয়।

এখনকার নাটকের ভাষারূপ এবং এর প্রয়োগ কি সঠিক ও যথাযথ হচ্ছে বলে আপনি মনে করেন?

– আসলে নাটকের সংলাপের জন্য নিয়মতান্ত্রিকতা এবং ব্যাকরণ কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হচ্ছে, ভাষার শুদ্ধ উচ্চারিত রূপ। এবং এই শুদ্ধ উচ্চারণ করাটাই এক্ষেত্রে জানা প্রয়োজন। না হলে, ভাষার মান ঠিক থাকবে না। বাংলা ভাষার নিদর্শন দেখাতে উপভাষা ব্যবহার করা ঠিক নয়। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, ‘গ্রহণযোগ্যতার চেয়ে বোধগম্য হওয়াটাই বেশী জরুরি’।

এখনকার তরুণদের মধ্যে সাহিত্যবোধ জাগিয়ে তুলতে এবং তাদের কবিতা বিমুখতা দূর করতে মানে সর্বোপরি তাদের বাংলা সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী করতে আমাদের কি করনীয়?

– এ ব্যাপারে চ্যানেল আই-তে আমি একবার আলোচনা করেছিলাম। আমার সাথে ছিলেন, বাংলা একাডেমীর মহাধ্যক্ষ শামসুজ্জামান খান। আসলে আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন বিনোদনের জন্য বাবা-মা আমাদের হাতে বই তুলে দিতেন। বই পড়ে, বইয়ের চরিত্ররূপকে কল্পনা করে, আমরা বেড়ে উঠেছি। ছেলেবেলায় আমাদের পাড়ার একটি লাইব্রেরির নাম ছিল, ‘সীমান্ত গ্রন্থাগার’, সেখান থেকে বই তুলে পড়েছি আমরা। এখনও বাবা-মায়েরা সন্তানের ভিতর সেই অভ্যাসটা জাগিয়ে রাখতে পারেন। কেবল বিশেষ বিশেষ দিনে বই কিনে দেয়া নয়, একটি ভালো বইয়ের সত্যিকার অর্থ যদি ছেলেমেয়েদের বুঝানো যায়। তাহলে আমরা আশা রাখি, জাতি সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী হবে।

১৯৭১-এর বাংলাদেশ বেতারে আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিলেন- সে সম্পর্কে আমাদেরকে কিছু জানান

– এটি আসলে কলকাতা থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো। তখন এটি যে বাড়ি থেকে পরিচালিত হতো, সেটি ছিল বালিগঞ্জ পাড়ায়। স্বাধীন বাংলা বেতারে আমার দায়িত্বটি ছিল, ইংরেজি বিভাগ পরিচালনা করা। যেকোনো যুদ্ধকালীন সংবাদ, সাক্ষাৎকারকে ইংরেজিতে রুপায়ণ করাটা ছিল, আমার কাজগুলোর মধ্যে একটি।

‘মুক্তির গান’ চলচ্চিত্রে কি বাংলাদেশ বেতারের কোনো অংশগ্রহন ছিল?

– না, সে অর্থে ছিল না। অনেকে ধারনা করেন, তারেক মাসুদ এটি নির্মাণ করেছিলেন। উনার এই চলচ্চিত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও, চলচ্চিত্রটি নির্মাণের মূল দায়িত্বে ছিল, ‘বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’। এর নেতৃত্বে ছিলেন দুইজন,

১. ওয়াহিদুর হক,

২. সানজিদা খাতুন।

আগের আলী যাকের- যিনি আমাদের সবার প্রিয় এবং শ্রদ্ধেয়, তাঁকে আমরা আবার কিভাবে ফিরে পেতে পারি?

– আমাকে আসলে কিভাবে ফিরে পেতে চাও? যাই হোক, আমি মঞ্চে কাজ করে যাচ্ছি, যাব। আমাদের যে সংস্থাটি আছে, সেটি হচ্ছে, ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’। আমি সেখানে ছেলেমেয়েদেরকে অভিনয়ের দিকনির্দেশনা দেয়ার চেষ্টা করি।

মঞ্চ ও টিভি- কোন মাধ্যমটি আপনার বেশী পছন্দ?

– অবশ্যই মঞ্চ। টিভি-তে কেবল বেশী দর্শক দেখতে পায়। এটা একটা পার্থক্য।

অনেক গুণী শিল্পীরাই অভিনয়ের প্লাটফর্ম হিসেবে মঞ্চকে বেশী পছন্দ করেন, এর কোনো বিশেষ কারন আছে কি?

– বিশেষ কারন তো আছেই। কারন মঞ্চের নাটকটির চার/ছয় সপ্তাহ রিহার্সেল হয়, রীতিমত মহড়া হয়। মঞ্চে যে দর্শক সামনে বসে থাকে, তাদের সাথে অভিনেতার যে কেমিস্ট্রি তৈরি হয়, সেটা সরাসরি মঞ্চের মাধ্যমেই বুঝতে পারা যায়। এটা একটা নেশা, যাকে বলা যায় ‘সংযোগ স্থাপনের নেশা’।

মঞ্চে আপনার পছন্দের চরিত্র কোনটি?

– গ্যালিলিও, শেক্সপিয়ারের ‘হেমলেট’ ও ‘ম্যাকবেথ’, দেওান গাজী, নুরালদীন।

টিভি-তে আপনার অভিনিত কোনো নাটকের এমন কোনো সংলাপ, যেটি এখনও মনে পড়ে?

– ‘বহুব্রীহি’ নাটকে দেখা যেত যে, আবুল হায়াত আমাকে বকতেন, আর আমি বলতাম, ‘দুলাভাই আপনার এই কথাটা ঠিক না’।

আপনি কি কখনও চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন?

– হ্যাঁ। প্যারালাল ছবিতে অভিনয় করেছি।

১. মোরশেদুল ইসলামের ছবি, ‘আগামী’ ও ‘বৃষ্টি’

২. তানভীর মোকাম্মেলের, নদীর নাম মধুমতি, ‘রাবেয়া’।

এখনকার শিল্পীদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

– এখনকার শিল্পীদের চারটি বিষয় মনে রাখতে হবে।

১. অনুশীলন

২. অধ্যবসায়

৩. অনুভূতি পরায়ণতা

৪. প্রতিটি নাটকে একটি সুপার অবজেকটিভ আছে, এটা মাথায় রাখতে হবে। আর কি বললাম, কেন বললাম- তার উপর নির্ভর করে, কিভাবে বললাম- এটা বুঝতে হবে।

আপনি কি কখনও বাংলাদেশ বেতারে নাটক করেছেন?

– একসময় করেছি।

বর্তমানে বাংলাদেশ বেতারের অবস্থা কেমন?

– বেতারের নাটক অনেক এগিয়ে আছে। অনেক ভালো করছে ওরা। একটা কথা মনে রাখতে হবে, বচন ঠিক না হলে, অর্ধেক অভিব্যক্তি নষ্ট হয়ে যায়।

মানুষ যদি না হতেন, তাহলে কি হতে চাইতেন?

– পাখি হতে চাইতাম।

এমন কোনো ইচ্ছার কথা বলুন, যেটা পূর্ণ হলে, মনের স্বাদ মিটে যায়।

– আমার সন্তান যেন থাকে, দুধে-ভাতে। এটি একমাত্র চাওয়া, একমাত্র ইচ্ছে।

পরিশেষে আমরা BDtimes24.com-এর পরিবারের পক্ষ থেকে পরম শ্রদ্ধেয় আলী জাকের সাহেবের প্রতি সম্মান জানিয়ে তার ও তার পরিবারের সকল সদস্যের সুস্বাস্থ্য কামনা করে এখানেই ইতি টানছি।

Facebook Comments
Spread the love
  • 65
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    65
    Shares