অনলাইন কিংবা ষ্টেশন ট্রেনের টিকেট মিলছে না ঈদে ঘরে ফেরা মানুষদের

রাজধানীর কাঁঠালবাগান এলাকার বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন। ১ জুন থেকে ঈদের অগ্রিম টিকিট অনলাইনে কাটতে গিয়ে কাটতে পারেননি। পরের দিন একইভাবে চেষ্টা করেন তিনি। সেদিনও কাটতে পারেননি। কয়েক দিন ধরে তিনি চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছেন। আজ মঙ্গলবার সকালেও একই অবস্থা। সকাল থেকে বারবার চেষ্টা করেও অনলাইনে টিকিট কাটতে পারেননি তিনি।

ইসমাইল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঈদ এলেই অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কাটা যায় না। আজকে সকালে আমি ১৪ জুনের আগাম টিকিট পেতে অনলাইনে ঢুকি। প্রথমে দেখায় সার্ভার ব্যস্ত। পরে অনেক চেষ্টায় ঢুকে যখন গন্তব্য সিলেক্ট করতে যাব, তখন কোনো অপশন দেখাচ্ছিল না। আবার এক ঘণ্টার চেষ্টায় যখন বেলা ১১টার দিকে ঢুকতে গেলাম, তখন দেখায় টিকিট শেষ হয়ে গেছে।’

অনলাইনে টিকিট করা প্রসঙ্গে ইসমাইলের মতো একাধিক ব্যক্তি বলেছেন, প্রতিবছর এই সমস্যা হয়। অনেক চেষ্টাতেও অনলাইনে টিকিট মেলে না। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, ঈদের সময় ইচ্ছে করে সার্ভার ডাউন করে রাখা হয়। কোনো চক্র এসব টিকিট রেখে দেয়।

তবে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ঈদের টিকিট কাটতে কিছুটা সমস্যা হতেই পারে। তবে একেবারে টিকিট না পাওয়ার বিষয়টি ঠিক নয়।

কলাবাগান এলাকার বাসিন্দা সাব্বির হোসেন জানালেন, ট্রেনের টিকিট অনলাইনে কাটতে গত ৬ দিন ধরে চেষ্টা করছেন। কিন্তু টিকিট মেলেনি। তিনি বলেন, ‘সকাল ছয়টা থেকে অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য চার বন্ধু চারটি ল্যাপটপে বসে পড়ি। সবাই সবার মতো করে ঢোকার চেষ্টা করি কিন্তু রেলের অনলাইন সার্ভারে ঢুকতে পারিনি। যখন ঢুকতে পারি, তখন বলে যে টিকিট শেষ হয়ে গেছে। তাহলে এই অনলাইন অপশন দিয়ে সময় নষ্ট করে আমাদের কী লাভ হলো?’
সাব্বিরের বন্ধু মোস্তাফিজ বলেন, তাঁর বাড়ি দিনাজপুরে তিনি অন্য সময় অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কেটে বাড়ি থেকে ঢাকা যাওয়া-আসা করেন। কিন্তু গত দুই বছরে ঈদের সময় আগাম টিকিট অনলাইনে পাননি। এ বছরও একই অবস্থা। অনলাইনে টিকিট কাটতে না পেরে ক্ষুব্ধ এই তরুণ চাকরিজীবী বলেন, ‘আমরা সময় নষ্ট করে চেষ্টা করেই যাচ্ছি। টিকিট মেলা তো দূরেই থাক, সার্ভারে ঢোকা যায় না। ঈদের সময় এলেই কেন এমন হবে, এই প্রশ্ন তুলে মোস্তাফিজ বলেন, আমার মনে হয়, ইচ্ছা করেই ঈদের সময় সার্ভার ডাউন করে রাখা হয়।’ এই টিকিট অনলাইনে পাওয়া না গেলেও দালালের কাছে ঠিকই টিকিট মেলে বলে জানান মোস্তাফিজ। তিনি অভিযোগ করে বলেন, গত বছরে অনলাইনে টিকিট না পেয়ে এক দালালের মাধ্যমে দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে একটি টিকিট কেটে বাড়ি গিয়েছিলেন। রাস্তার অবস্থা খারাপ ও যানজটের কথা ভেবে বাধ্য হয়ে দ্বিগুণ দাম দিয়ে টিকিট নিয়েছিলেন। তাঁর ধারণা এবারও সেভাবেই টিকিট সংগ্রহ করতে হবে।
গুলশানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী আসিফ মাহমুদ। অফিসে থাকার জন্য তিনি কমলাপুরে গিয়ে ট্রেনের টিকিট কাটতে পারেন না বলে অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কাটার চেষ্টা করেন। কিন্তু গত কয়েক দিনে তিনিও অনলাইনে টিকিট কাটতে পারেন না। আসিফ বলেন, ‘অনলাইনে টিকিট কাটতে চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছি। অনেক সময় ব্যয় করেছি। লাভ হয়নি। যে সময় ধরে ট্রেনের টিকিটের চেষ্টা করেছি, সেই সময় অনেক কিছু করা যেত। এর একটা সমাধান হওয়া দরকার।’

গত তিন দিন সরেজমিনে কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, টিকিট দেওয়া শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই কাউন্টার থেকে বলা হয় তাপানুকূল কোচগুলোর টিকিট শেষ।

গতকাল রাত তিনটা থেকে টিকিট কাটার জন্য রেলের কাউন্টারে বসে ছিলেন মো. গিয়াসউদ্দিন। পরিবারের সঙ্গে ঈদ কাটাতে ১৪ জুন সিলেট যাবেন তিনি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর সকাল নয়টার দিকে তাপানুকূল (এসি) কোচের টিকিট চেয়ে পেলেন শোভন চেয়ারের টিকিট। কাউন্টার থেকে জানানো হয়, এসির টিকিট শেষ হয়ে গেছে। অথচ লাইনে তাঁর সিরিয়াল ছিল ৪০ নম্বর। আজ সকালে কাঙ্ক্ষিত টিকিট না পেয়ে হতাশার কথা এভাবেই জানালেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিরত মো. গিয়াসউদ্দিন।
গিয়াসসহ আরও কয়েকজন অভিযোগ করেন, ঈদের এসি টিকিট রেলের একদল অসাধু চাকরিজীবী দখল করে রাখেন। সেগুলো কাউন্টার বা অনলাইনে ছাড়া হয় না। পরে বেশি দাম দিয়ে মানুষের কাছে কালোবাজারে বিক্রি হয়।

অনলাইনে রেলের টিকিট কাটতে সমস্যার কথা জানালে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক প্রথম আলোকে বলেন, মোট টিকিটের ৭৫ শতাংশ কাউন্টারে এবং বাকি ২৫ শতাংশ টিকিট অনলাইনে বিক্রি করা হয়। অনলাইনে টিকিট পেতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

ঈদ উপলক্ষে পৌনে তিন লাখ যাত্রী যেতে পারবে মন্তব্য করে রেলমন্ত্রী বলেন, রেলে সাধারণ সময়ে ২ লাখ ৬০ হাজার জন যাত্রী চলাচল করতে পারে। ঈদ উপলক্ষে সর্বোচ্চ তিন লাখ মানুষ আসা-যাওয়া করতে পারবে বলে আশা করা যায়। এর চেয়ে বেশি যাত্রী নেওয়া তো সম্ভব নয়।

অনলাইনে ট্রেনের টিকিটের ব্যবস্থাপনায় আছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম (সিএনএস)।

সিএনএসের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) একরাম ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সার্ভার ডাউনের অভিযোগ ঠিক নয়। অনেক মানুষ একসঙ্গে সার্ভারে ঢোকেন, তাই নেটওয়ার্ক ব্যস্ত পান। আমরা সকাল ৮টা থেকে ১১টা ৫৯ পর্যন্ত সার্ভার খোলা রাখি। শুধু ১২টা থেকে ১২টা ১ মিনিট—এই দুই মিনিট সার্ভার বন্ধ থাকে। আবার পরে চালু করে দেওয়া হয়।
অনলাইনে প্রতিদিন শত শত মানুষ টিকিট কাটছেন বলে জানান একরাম ইকবাল। তবে কিছু মানুষ সমস্যায় পড়েন বলে স্বীকার করেন তিনি। এ জন্য ইন্টারনেট ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা জানান তিনি। তবে অনলাইনে ২৫ শতাংশ টিকিট পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করেন তিনি।

Facebook Comments
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •