একের পর এক শীর্ষ নেতাকে হারিয়েও যেভাবে টিকে রইল ইরান!
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের শুরুতে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ভয়াবহ হামলার মুখে হয়তো ইরানের শাসনব্যবস্থা বড় ধাক্কায় ভেঙে পড়বে। রাজধানী তেহরানে একের পর এক বিস্ফোরণ, ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ভবন এবং জরুরি সাইরেনের শব্দে যুদ্ধের প্রথম কয়েক ঘণ্টাই ছিল ভয়াবহ। একই সঙ্গে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের মৃত্যুর খবর ইরানসহ আন্তর্জাতিক মহলে গভীর শোকের সৃষ্টি করে।
এই যুদ্ধে শুধু সামরিক ঘাঁটি নয়, ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রও বড় আঘাতের মুখে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে নিশানা করা হয় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্বদের। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি থেকে শুরু করে সামরিক প্রধান, গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের অনেকেই নিহত হন। তবে এত বড় ক্ষয়ক্ষতির পরও যুদ্ধ থামায়নি তেহরান।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই বিমান হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ১৯৮৯ সাল থেকে তিনি দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বে ছিলেন। তেহরানে নিজ বাসভবনে একটি বৈঠক চলাকালে হামলার শিকার হন তিনি। ওই হামলায় তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যও নিহত হন। তবে আহত অবস্থায় বেঁচে যান তার ছেলে মোজতবা খামেনি, যিনি পরবর্তীতে দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন।
এর কিছুদিন পর আরেকটি বড় ধাক্কা আসে নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলী লারিজানির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে পরিচিত এই নেতা মার্চ মাসে ইসরায়েলি হামলায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিহত হন। বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির পর লারিজানির মৃত্যু ছিল তেহরানের জন্য অন্যতম বড় ক্ষতি।
একই দিনে প্রাণ হারান ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)-এর প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় যুদ্ধক্ষেত্রে তার মৃত্যু ঘটে। পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আবদুর রহিম মুসাভিও নিহত হন। তিনি আইআরজিসি ও নিয়মিত সেনাবাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন। এর বাইরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ এবং সামরিক কার্যালয়ের প্রধান মোহাম্মদ শিরাজিও প্রথম দিনের হামলায় নিহত হন।
যুদ্ধের ধাক্কায় আরও প্রাণ হারান ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কৌশলবিদ আলী শামখানি। তেহরানের তাজরিশ স্কয়ারে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে নিহত হন নৌবাহিনীর প্রধান আলিরেজা তাংসিরি, যিনি হরমুজ প্রণালিতে সামরিক কৌশল বাস্তবায়নের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খাতিব, আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ-এর প্রধান গোলামরেজা সুলেইমানি এবং আইআরজিসির মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নাইনিও প্রাণ হারান এই হামলায়। মৃত্যুর কিছু সময় আগেও নাইনি জানিয়েছিলেন, চলমান সংঘাত সত্ত্বেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ৫০ জনের বেশি শীর্ষ পর্যায়ের ইরানি নেতা নিহত হয়েছেন।
তবে এত বড় ক্ষয়ক্ষতির পরও ইরান ভেঙে পড়েনি। বরং দ্রুত নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলে যুদ্ধ চালিয়ে যায় দেশটি। অনেকের ধারণা ছিল, এই হামলা ইরানের রাজনৈতিক পতনের পথ তৈরি করবে। কিন্তু বাস্তবে তেহরান দ্রুত নিজেদের পুনর্গঠন করে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করে এবং একটি সমঝোতায় পৌঁছায়।
What's Your Reaction?