ওজন বাড়ার ভয় থেকে প্রাণঘাতী মানসিক রোগ, কেন বেশি আক্রান্ত হন মডেল ও তারকারা?
শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়ার তীব্র ভয়ের কারণে খাবার গ্রহণ অত্যন্ত সীমিত করে ফেলা—এটাই অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা নামের গুরুতর মানসিক ব্যাধির প্রধান বৈশিষ্ট্য। খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির ওজন স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় অনেক নিচে নেমে যায়, যা শারীরিক ও মানসিক উভয় ধরনের জটিলতার কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মডেল, অভিনয়শিল্পী, নৃত্যশিল্পী, জিমন্যাস্ট, ক্রীড়াবিদসহ যেসব পেশায় শারীরিক গঠন বা ‘বডি ইমেজ’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, সেসব ক্ষেত্রের মানুষদের মধ্যে এ রোগ তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
যদিও কিশোরী ও তরুণীদের মধ্যে অ্যানোরেক্সিয়ার হার বেশি, তবে পুরুষ, শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্করাও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।
কেন হয় অ্যানোরেক্সিয়া?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসার পেছনে কোনো একক কারণ নেই। বরং মানসিক, জৈবিক, পারিবারিক এবং সামাজিক নানা উপাদান একসঙ্গে কাজ করে এই রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
মানসিক কারণ
-
অতিরিক্ত পরিপূর্ণতাবাদী মানসিকতা
-
আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মানবোধের ঘাটতি
-
উদ্বেগ ও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা
-
বিষণ্নতা
-
নিজের শারীরিক গঠন নিয়ে অসন্তুষ্টি
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব
সমাজে রোগা শরীরকে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা, ফ্যাশন ও বিনোদন জগতে ওজন নিয়ে চাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথাকথিত ‘নিখুঁত শরীর’-এর ছবি দেখে প্রভাবিত হওয়া এবং পরিবার বা বন্ধুদের কাছ থেকে ওজন নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য—এসব বিষয়ও অ্যানোরেক্সিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
জৈবিক ও পারিবারিক কারণ
পরিবারে যদি খাওয়াদাওয়াজনিত ব্যাধি বা অন্য কোনো মানসিক রোগের ইতিহাস থাকে, তাহলে ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া মস্তিষ্কের কিছু রাসায়নিক উপাদান, বিশেষ করে সেরোটোনিনের ভারসাম্য পরিবর্তনের সঙ্গেও এ রোগের সম্পর্ক রয়েছে।
রোগের লক্ষণ কী?
অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত ওজন বাড়ার বিষয়ে অস্বাভাবিক ভয় অনুভব করেন। তারা খাবার এড়িয়ে চলেন, প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম খান এবং অনেক সময় নিজের শরীরকে বাস্তবতার চেয়ে বেশি মোটা মনে করেন।
ওজন কমানোর জন্য অতিরিক্ত ব্যায়াম, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা কিংবা কঠোর ডায়েট অনুসরণ করার প্রবণতাও দেখা যায়।
শারীরিক ও মানসিক প্রভাব
এ রোগে আক্রান্ত হলে—
-
বিএমআই (বডি মাস ইনডেক্স) উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়
-
দ্রুত ওজন হ্রাস পায়
-
দুর্বলতা ও ক্লান্তি দেখা দেয়
-
ঘন ঘন ঠান্ডা বা অসুস্থতা অনুভূত হয়
-
অতিরিক্ত চুল পড়তে পারে
-
মাথা ঘোরা ও শারীরিক ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়
-
নারীদের মাসিক চক্রে অনিয়ম সৃষ্টি হয়
-
মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হয়
-
খাওয়া নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ তৈরি হয়
-
খাবারের প্রতি ভয় বা অনীহা জন্মায়
-
মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়
এছাড়া রোগটি দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিক উভয় ক্ষেত্রেই গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে।
চিকিৎসা না হলে কী ঝুঁকি?
দীর্ঘ সময় চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় থাকলে হৃদ্যন্ত্রের জটিলতা, কিডনির ক্ষতি, হাড়ক্ষয়, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং তীব্র অপুষ্টিসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।
চিকিৎসা কী?
অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসার চিকিৎসায় সাধারণত সমন্বিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
-
পুষ্টিবিদের পরামর্শে স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসে ফিরে আসা
-
স্বাস্থ্যকর ওজন পুনরুদ্ধার করা
-
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিজ্ঞানীর কাউন্সেলিং
-
পরিবারভিত্তিক থেরাপি
-
প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্বেগ ও বিষণ্নতার চিকিৎসা
সচেতনতা জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যানোরেক্সিয়া শুধুমাত্র ওজন কমানোর চেষ্টা বা রোগা হওয়ার ইচ্ছা নয়। এটি এমন একটি জটিল মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যা মানুষের শরীর, খাদ্যাভ্যাস এবং আত্মপরিচয় সম্পর্কে ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাই এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পেশাদার চিকিৎসা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
What's Your Reaction?