যুদ্ধের প্রভাবে হিলিয়াম সংকট, এমআরআই সেবায় বিলম্বের আশঙ্কা
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সংঘাতের জেরে বৈশ্বিক হিলিয়াম সরবরাহে গুরুতর বিঘ্ন দেখা দিয়েছে, যার প্রভাব চিকিৎসা খাতসহ বিভিন্ন উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এমআরআই স্ক্যান সেবায় বিলম্ব অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। বিষয়টি নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আল জাজিরা।
সরবরাহে বড় ধাক্কা
বর্তমানে বিশ্বে ব্যবহৃত মোট হিলিয়ামের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এর প্রধান কারণ উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং কাতারের উৎপাদন কমে যাওয়া। হিলিয়াম মূলত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদনের উপজাত, ফলে এলএনজি উৎপাদন ব্যাহত হলে হিলিয়াম সরবরাহও সরাসরি কমে যায়।
২০২৫ সালে কাতার প্রায় ৬৩ মিলিয়ন ঘনমিটার হিলিয়াম উৎপাদন করেছে, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তবে এই সরবরাহের বেশিরভাগই সমুদ্রপথে রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি হয়ে।
হরমুজ প্রণালিতে সংকটের প্রভাব
সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত সীমিত হয়ে পড়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে নতুন শর্ত আরোপ করায় তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারছে না। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে কাতারের রাস লাফান ও মেসাইদ শিল্পাঞ্চলে হামলার ফলে এলএনজি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে দেশটির মোট রপ্তানি সক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশ কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে হিলিয়াম উৎপাদনে, যা বছরে প্রায় ১৪ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরিবহনেও জটিলতা
হিলিয়াম পরিবহন অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রক্রিয়া। এটি তরল আকারে বিশেষ কন্টেইনারে সংরক্ষণ করা হয় এবং তরলীকরণের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবহার করতে হয়। সাধারণত ৪৫ দিনের মধ্যে ব্যবহার না করলে তা আবার গ্যাসে পরিণত হয়ে অপচয় হয়। ফলে পরিবহনে বিলম্ব হলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ে।
কারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে
এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান ও চীন—যারা কাতারের হিলিয়ামের বড় ক্রেতা। যদিও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে সরবরাহ হয়ে থাকে, তবুও ঘাটতি তৈরি হলে বাজারে চাপ বাড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, ৩০ দিনের সরবরাহ বিঘ্ন ঘটলে হিলিয়ামের দাম ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আর ৬০ থেকে ৯০ দিনের সংকটে দাম ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হিলিয়াম
হিলিয়াম একটি বিশেষ গ্যাস, যা অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় তরল অবস্থায় স্থিতিশীল থাকে এবং অন্য কোনো উপাদানের সঙ্গে বিক্রিয়া করে না। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে এমআরআই মেশিনে ব্যবহৃত সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট ঠান্ডা রাখতে এটি অপরিহার্য।
বিশ্বে ব্যবহৃত মোট হিলিয়ামের প্রায় এক-চতুর্থাংশই এমআরআই যন্ত্রে ব্যবহৃত হয়। ফলে সরবরাহ কমে গেলে চিকিৎসা খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
প্রযুক্তি শিল্পেও প্রভাব
হিলিয়াম শুধু চিকিৎসা খাতেই নয়, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্মার্টফোন, যানবাহন, ডেটা সেন্টারসহ আধুনিক প্রযুক্তির নানা ক্ষেত্রে এর ব্যবহার রয়েছে।
বিকল্পের সীমাবদ্ধতা
বর্তমানে হিলিয়ামের কার্যকর বিকল্প নেই। যদিও কিছু গবেষণায় হিলিয়ামবিহীন এমআরআই প্রযুক্তি বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, সেগুলো এখনো বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক ব্যবহারযোগ্য হয়নি।
পূর্বের সংকট ও বর্তমান পরিস্থিতি
২০০৬ সালের পর থেকে বিশ্বে একাধিকবার হিলিয়াম সংকট দেখা গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিকে সেই ধারাবাহিকতার পঞ্চম বড় সংকট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশ্বে সবচেয়ে বড় হিলিয়াম উৎপাদক যুক্তরাষ্ট্র হলেও তারাও উপসাগরীয় সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। ইতোমধ্যে বড় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও শিল্প খাতে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে এমআরআইসহ গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে বিলম্ব অনিবার্য হয়ে উঠবে।
What's Your Reaction?