সচিবালয়ে ২১ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা, ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন

Apr 5, 2026 - 13:14
 0  10
সচিবালয়ে ২১ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা, ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন

রাজধানীর প্রশাসনিক কেন্দ্র Bangladesh Secretariat–এ মন্ত্রণালয়গুলোর অফিস স্পেস বাড়াতে নতুন বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভূমিকম্প ঝুঁকির কারণে বিদ্যমান ১ নম্বর ভবন ভেঙে সেখানে ২১ তলা একটি আধুনিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রস্তাবিত এই ভবনের মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ ৮৭ হাজার বর্গফুট জায়গা যুক্ত হবে। নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রতি বর্গমিটার ৫২ হাজার ৭০৪ টাকা, যা নিয়ে ইতোমধ্যে স্থাপত্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সমালোচনা শুরু হয়েছে।

প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য Planning Commission Bangladesh–এ পাঠানো হয়েছে। আগামী ৬ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে এটি উপস্থাপন করা হবে। জানা গেছে, বৈঠকে মোট ১৭টি প্রকল্পের তালিকায় এটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং মোট ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৬৪৯ কোটি টাকা।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সচিবালয়ে ইতোমধ্যে ভবনের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় নতুন ভবন নির্মাণের ফলে যানবাহন পার্কিং সংকট আরও বাড়তে পারে। এ প্রসঙ্গে স্থপতি Iqbal Habib বলেন, যথাযথ মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি বিদ্যমান ভবনগুলো পুনর্বিন্যাসের পরামর্শ দেন।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমানে সচিবালয়ে প্রায় ৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৭২ বর্গফুট অফিস স্পেস থাকলেও অতিরিক্ত প্রয়োজন রয়েছে আরও প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুট। নতুন ভবন নির্মিত হলে এই ঘাটতির প্রায় ৪২ শতাংশ পূরণ হবে। এতে সচিবালয়ের বাইরে থাকা কিছু সরকারি দপ্তর স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হবে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব S M Shakil Akhtar বলেন, সচিবালয়ের অনেক ভবন পাকিস্তান আমলের এবং বেশ কয়েকটির বয়স ৬০ বছরের বেশি। ফলে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও সেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ভবিষ্যতে আরও দুটি ভবন নির্মাণ করা গেলে পুরোনো কাঠামো পর্যায়ক্রমে অপসারণ সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।

নতুন ভবনে প্রায় ২০০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্ক

২১ তলা ভবনের সঙ্গে ৪ তলা বেজমেন্টসহ মোট ২৫ তলা কাঠামো নির্মাণে প্রায় ৩৬১ কোটি টাকা ব্যয় হবে, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৫৬ শতাংশ। এই হিসেবে প্রতি বর্গমিটার নির্মাণ ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে Iqbal Habib মন্তব্য করেন, এ ধরনের ব্যয় ‘অস্বাভাবিক উচ্চ’ এবং অপচয়ের শামিল।

প্রকল্প প্রস্তাবে দেখা যায়, ২৪০০ টন ক্ষমতার কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ কোটি টাকা। এছাড়া ১৪টি লিফট স্থাপনে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রতিটির গড় মূল্য ২ কোটির বেশি।

লিফটের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডে তুলনামূলক কম মূল্যে লিফট পাওয়া সম্ভব।

এছাড়া অগ্নিনির্বাপণ ও সুরক্ষা ব্যবস্থায় ১৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা, সৌরবিদ্যুতে ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং পাঁচটি জেনারেটরে ৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। পানি পরিশোধন ব্যবস্থায় ৩ কোটি এবং আসবাবপত্রে ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিদেশে প্রশিক্ষণ বাবদ ৮০ লাখ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব S M Shakil Akhtar স্বীকার করেছেন, প্রকল্পে ব্যয় তুলনামূলক বেশি ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের কারণে ব্যয়ের একটি বড় অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

যেসব সুবিধা থাকবে নতুন ভবনে

প্রস্তাবিত ভবনটিকে আধুনিক ‘গ্রিন বিল্ডিং’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং উন্নত নিরাপত্তা প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

ভবনে মোট ১৪টি লিফট, ২০টি কনফারেন্স রুম, কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং চার স্তরের বেজমেন্ট পার্কিং থাকবে। এছাড়া দেড় লাখ গ্যালন ধারণক্ষমতার ভূগর্ভস্থ জলাধার ও ১০ হাজার গ্যালন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে Public Works Department Bangladesh। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।

বর্তমানে সচিবালয়ে মোট ১১টি ভবন রয়েছে। নতুন ভবনটি নির্মিত হলে প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow