সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

May 12, 2026 - 15:23
 0  12
সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী ও দক্ষতাভিত্তিক করার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী Tarique Rahman বলেছেন, শুধু মুখস্থবিদ্যা ও সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বাস্তবতায় শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা ও উদ্ভাবনে আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে।

মঙ্গলবার সকালে University of Dhaka–এর নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত ‘ট্রান্সফর্মিং হাইয়ার এডুকেশন ইন বাংলাদেশ: রোডম্যাপ টু সাসটেইনেবল এক্সিলেন্সি’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা আর শুধু স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে ডাটা সায়েন্স, বায়োলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও সমাজবিজ্ঞানের মতো বিভিন্ন বিষয়ের সমন্বয়ে জ্ঞানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। তাই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও বাস্তবমুখী করতে হবে।

তিনি বলেন, প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বের হলেও অনেকেই বেকার থাকছেন। এর অন্যতম কারণ হলো একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে ঘাটতি থাকা। এজন্য শিক্ষা কারিকুলামে ব্যবহারিক ও কর্মমুখী শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বৈশ্বিক র‌্যাংকিং প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রকাশনা ও সাইটেশনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবটিক্স, অটোমেশন, সাইবার সিকিউরিটি, বায়োটেকনোলজি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও ন্যানো টেকনোলজির মতো প্রযুক্তি এখন কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিকে নতুনভাবে প্রভাবিত করছে। এসব প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে যেমন কিছু প্রথাগত চাকরির সুযোগ কমছে, তেমনি নতুন ধরনের কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, উচ্চশিক্ষাকে সময়োপযোগী করতে সরকার বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে সংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বিভাগীয় শহরগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে এপ্রেন্টিসশিপ, ইন্টার্নশিপ ও ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন।

তিনি আরও বলেন, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণা বাস্তবায়নে সিড ফান্ডিং ও ইনোভেশন গ্রান্ট দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো ক্যাম্পাস থেকেই নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইনোভেশন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট এবং সায়েন্স পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু চাকরিপ্রত্যাশী নয়, শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। এতে তারা নিজের পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করতে পারবেন।

ব্রিটিশ লেখক ও বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট Tom Wainwright–এর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, উবারের নিজস্ব ট্যাক্সি নেই, ফেসবুক নিজে কনটেন্ট তৈরি করে না, আলিবাবার কোনো মজুদ পণ্য নেই এবং এয়ারবিএনবির নিজস্ব রিয়েল এস্টেটও নেই। তবুও উদ্ভাবনী ধারণা ও প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার করছে। এটিই প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানের শক্তি।

শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের এলামনাইরা গবেষণা ও উদ্ভাবনে পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকেন। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও এলামনাইদের সম্পৃক্ত করে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।

মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সঠিক পরিকল্পনা ও সুযোগ তৈরি করা গেলে বাংলাদেশের মেধাবীরাও বিশ্বমানের অবদান রাখতে সক্ষম হবেন। মেধা পাচার রোধ করে মেধার বিকাশ নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার একটি জ্ঞান ও মেধানির্ভর সমাজ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে শিক্ষা, গবেষণা, যোগ্যতা ও সৃজনশীলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ অর্জনের পাশাপাশি ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ রক্ষার প্রতিও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে University Grants Commission of Bangladesh–এর পক্ষ থেকে ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। এছাড়া বক্তব্য দেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক এবং ইউজিসি সচিব ফখরুল ইসলাম।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow