সিলেটে হামে ৩৫ শিশুর মৃত্যু, বাড়ছে উদ্বেগ; হাসপাতালে রোগীর চাপ বৃদ্ধি

May 17, 2026 - 17:23
 0  10
সিলেটে হামে ৩৫ শিশুর মৃত্যু, বাড়ছে উদ্বেগ; হাসপাতালে রোগীর চাপ বৃদ্ধি

সিলেট বিভাগজুড়ে হাম ও রুবেলার সংক্রমণ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। শিশুদের মধ্যে রোগটির বিস্তার এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, চলতি বছরে বিভাগটিতে হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত সংক্রমণে মোট ৩৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৭৮ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

শনিবার (১৬ মে) রাতে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে বিভাগজুড়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ৩২১ জন সন্দেহজনক রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট ১৪৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে হবিগঞ্জে ১৬ জন (যার দুইজন রুবেলায় আক্রান্ত), মৌলভীবাজারে ১৬ জন, সুনামগঞ্জে ৭৫ জন এবং সিলেট জেলায় ৪২ জন রয়েছেন।

গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৭৮ জনের মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১৯ জন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০ জন, পার্ক ভিউ মেডিকেলে একজন, রাগীব-রাবেয়া মেডিকেলে তিনজন, নর্থ ইস্ট হাসপাতালে একজন, মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে আটজন, শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুইজন, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ১৮ জন, বিশ্বম্ভরপুরে একজন, দিরাইয়ে চারজন এবং তাহিরপুরে একজন ভর্তি হয়েছেন।

বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মোট ৩২১ রোগীর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে ১০৮ জন, ওসমানী মেডিকেলে ৮০ জন, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ৫৫ জনসহ অন্যান্য হাসপাতালেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী ভর্তি রয়েছেন।

স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে সন্দেহজনক হামে ৩১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া নিশ্চিতভাবে হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে আরও চারজন। সব মিলিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫ জনে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদান সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা। তবে টিকাদানে ঘাটতি, অভিভাবকদের অসচেতনতা এবং করোনা-পরবর্তী সময়ে অনেক শিশুর নিয়মিত টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত একজন শিশুর সংস্পর্শে এলে দ্রুত অন্য শিশুর মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়ে যেতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি আরও বেশি থাকে।

হামের পাশাপাশি রুবেলার সংক্রমণও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, গর্ভবতী নারীরা রুবেলায় আক্রান্ত হলে তা অনাগত শিশুর জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

এদিকে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বাড়ছে। অনেক জায়গায় শয্যা সংকটও দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, অনেক পরিবার প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটিকে সাধারণ জ্বর বা অ্যালার্জি মনে করে অবহেলা করছে। পরে জটিলতা বাড়লে হাসপাতালে নিয়ে আসায় পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠছে।

সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি জোরদার করেছে। শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালের পাশাপাশি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে পিআইসিইউ বেডের সংখ্যা ১০ থেকে বাড়িয়ে ১৫ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ৫ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী যেসব শিশু এখনও টিকার বাইরে রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এই কর্মসূচির মেয়াদও আরও ১০ দিন বাড়ানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের মতে, আতঙ্ক নয়, বরং সচেতনতা ও দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow